গণঅভ্যুত্থান আসে, ক্ষমতার পটপরিবর্তন হয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্য আর কতটুকু বদলায়? আমাদের দেশের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক রক্তে ভেজা। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে নব্বইয়ের নূর হোসেন, কিংবা চব্বিশের আবু সাঈদ-মুগ্ধ—প্রতিটি গণঅভ্যুত্থানে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে সাধারণ মানুষের রক্তে। অথচ আক্ষেপের বিষয় হলো, এই বিশাল আত্মত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন আজও অধরা রয়ে গেছে।
গণঅভ্যুত্থান কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি একটি দেশের আমূল পরিবর্তনের আকুতি। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদের চারিত্রিক লালসা আর ক্ষমতার মোহ থেকেই বারবার রাজপথে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষ বুক পেতে গুলি খায়, মায়েরা সন্তান হারায়, কিন্তু দিনশেষে সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদেরা সেই রক্তের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেন। জনগণের জন্য যে অভ্যুত্থান ঘটে, তা কি আদৌ সাধারণের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটাতে পারে, নাকি কেবল শাসক বদলের চক্রে আমরা বন্দি হয়ে আছি?
রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়িয়ে নেতারা আজ বলিষ্ঠ কণ্ঠে আবেগপ্রবণ ভাষণ দেন। তাদের বাগাড়ম্বরে মাঠ কেঁপে ওঠে ঠিকই, কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর কি পৌঁছায় সেই সব মায়েদের কাছে, যারা নিরবে নিভৃতে বুকফাটা আর্তনাদ করছেন? মুগ্ধর ‘পানি লাগবে পানি’ কিংবা আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়া সাহসিকতা—এসবই কি কেবল নেতাদের বক্তৃতার খোরাক হওয়ার জন্য ছিল? সজন হারানো মানুষের হাহাকার কি ক্ষমতা ভোগীদের হৃদয়ে বিন্দুমাত্র নাড়া দেয়? ইতিহাস বলছে, যদি তারা সত্যি অনুভব করতেন, তবে বারবার রাজপথে নিরীহ জনগণের রক্ত ঝরত না।
বাংলাদেশের ইতিহাসে গণঅভ্যুত্থান এসেছে বারবার, কিন্তু রাজনীতির মূল ধারায় গুণগত পরিবর্তন আসেনি। একদল সুবিধাভোগী নেতৃত্ব সবসময় সাধারণের ত্যাগের ফল ঘরে তুলেছে। আমরা আর কত নূর হোসেন, কত আবু সাঈদ কিংবা মুগ্ধকে হারাতে দেব? কত মায়ের অশ্রু ঝরলে রাজনীতির এই ‘রক্তখোর’ সংস্কৃতি বন্ধ হবে?
সময় এসেছে এই প্রশ্ন করার। আমরা এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ চাই, যেখানে ক্ষমতার মোহে সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। রাজনীতির হায়নাদের থাবা থেকে মুক্তি চায় সাধারণ মানুষ। আর কোনো মায়ের কোল যেন শূন্য না হয়, আর কোনো পিতার কাঁধ যেন সন্তানের লাশের ভারে নুয়ে না পড়ে—এটাই হোক আগামীর অঙ্গীকার। অভ্যুত্থানের সার্থকতা কেবল ক্ষমতার পালাবদলে নয়, বরং রাজনীতির সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত।

সুদসহ টাকা ফেরতের দাবিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে আমানতকারীদের বিক্ষোভ
মোঃ মাসুম আহমেদ 


















