ঢাকা , বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo মাসের পরের অংশে ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি ভয়াবহ কালবৈশাখী আঘাত আনতে পারে Logo পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২,০২৮ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প নিয়েছে সরকার Logo গ্রীষ্মের দাবদাহে আরাম দেবে ঠান্ডা ডাব-কফির শেক Logo দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা চিনিকলগুলো আবার সচল হওয়ার আশা তৈরি হয়েছে Logo ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম-এ আসছে বড় ধরনের পরিবর্তন Logo প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চলছে একনেকের বৈঠক Logo উচ্ছেদের কিছুদিন পরই ফের দখলে চলে যাচ্ছে ফুটপাত, থামছে না হকারদের Logo সিলেটে আলোচিত শিশু ফাহিমা হত্যার রোহমর্ষক বর্ণনা দিলো হত্যাকারী চাচা জাকির Logo ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে শিশুদের মাদক থেকে বিরত রাখা জরুরি Logo খুলনা অঞ্চলে বোরো ফসল ঘরে তুলতে পুরোদমে চলছে কৃষকদের
বিজ্ঞপ্তি :
গৌরবময় ৩৫ বছর! মাসিক অবাক পৃথিবী পত্রিকার ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অগণিত পাঠক ও লেখককে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। 

দিন দিন বাড়ছে বজ্রপাতে মৃত্যু, তবুও সচেতন হচ্ছে না মানুষ

  • অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১২:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬
  • ১৩ বার পড়া হয়েছে

দেশে প্রতি বছর শতশত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে বজ্রপাত। সামপ্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে; সরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সূত্র মিলিয়ে দেখা যায়, প্রতি বছর গড়ে প্রায় তিনশোর কাছাকাছি মানুষ বজ্রপাতে মারা যায় এবং চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই অর্ধশতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। বজ্রপাতে মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা নতুন কিছু নয়; ২০১৬ সালের মে মাসের ভয়াবহ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। তারপরও বাস্তবে প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব, প্রকল্পের অনিশ্চয়তা ও মাঠ পর্যায়ে তৎপরতার ঘাটতি বজায় আছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বজ্রপাতে মোট ৩ হাজার ৪২৫ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে; তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। ২০১৬, ২০১৯, ২০২১, ২০২৩-এ মৃত্যুহার বিশেষভাবে বেশি ছিল- এগুলোই নির্দেশ করে যে বজ্রপাত এখন আর কেবল নির্দিষ্ট মৌসুমের সমস্যা নয়, বরং বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের প্রোফাইল প্রায়ই একই রকম: মাঠে কাজ করা কৃষক, হাওরাঞ্চলের মানুষ, নদীর তীরের মৎস্যজীবী এবং খোলা মাঠে খেলাধুলা করা শিশুরা- তারা বজ্রগর্জন শুনে নিরাপদ আশ্রয় না নিলে ঝুঁকিতে পড়েন। চলতি বছরের বৈশাখ মাসেই একদিনে সর্বাধিক ১৩ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়; একই সময়ে একদিনে ১৪ জনের মৃত্যুর খবরও আসে- গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, নাটোর ও পঞ্চগড়ে এসব ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে কৃষকের সংখ্যা বেশি; এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪ জন নিহত কৃষক ছিলেন। সরকারি উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে বড় ফাঁক দেখা যায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির (টিআর) আওতায় ২০২১-২২ অর্থবছরে বজ্রনিরোধক দণ্ড ও লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় এবং ১৫টি বজ্রপ্রবণ জেলায় ৩৪৩টি যন্ত্র স্থাপনের কথা বলা হয়। কিন্তু পরে তদন্তে উঠে আসে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ; অনেক স্থানে যন্ত্র বসানো হয়নি, বা বসানো হলেও তা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নয়- বজ্রপাতপ্রবণ হাওরাঞ্চলের মাঝখানে না বসিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ বাজার বা বসতিপূর্ণ এলাকায় বসানো হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেও অনেক যন্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এমনকি বড় প্রকল্পের পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পায়নি; ২০২২ সালে প্রস্তাবিত এক হাজার ২৩২ কোটি টাকার প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পায়নি- ফলে মাঠ পর্যায়ে কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেনি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় ‘মাল্টিপারপাস শেড’ নির্মাণের একটি প্রকল্প প্রণয়ন চলছে। এই শেডগুলো হাওরাঞ্চলসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থাপন করা হবে; আকাশে বজ্রমেঘ দেখলেই কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারবেন। শেডগুলোর সঙ্গে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা থাকবে এবং এগুলো ধান মাড়াই, স্বল্প সময়ের ধান সংরক্ষণ ও বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। প্রাথমিকভাবে এক বিঘা জমির ওপর প্রতিটি শেড নির্মাণের চিন্তা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্প চূড়ান্ত করতে উপজেলা পর্যায় থেকে প্রস্তাব সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সব প্রস্তাব পাওয়ার পরই প্রকল্পের পরিধি নির্ধারণ করা হবে; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রস্তাব পাওয়ার পরও দুই মাসের মতো সময় লাগতে পারে। বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতা বাড়ানোকে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখেন সংশ্লিষ্টরা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের দুর্যোগ কমিটিগুলোকে এক পৃষ্ঠার সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে বজ্রপাত সতর্কতা প্রচারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে ডিসিদের সাড়া নেই- অধিদপ্তরের চিঠি পাঠানো হলেও অনেক জেলা থেকে কোনো প্রতিবেদন আসেনি। এফপিওসিজি (ফোকাল পয়েন্ট অপারেশনাল কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ) সভায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বজ্রবৃষ্টি ও বজ্রপাত সতর্কতা প্রচারের সুপারিশ থাকলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর কাজ আছে, কিন্তু তাদেরও সীমাবদ্ধতা। ‘সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম’ বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তাদের হিসাব অনুযায়ী বজ্রপাতে ২ হাজার ৫৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং এদের ৭০ শতাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। সংগঠনটি পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত বিষয়ক অধ্যায় সংযোজন, মোবাইল ব্রডকাস্টের মাধ্যমে পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়া, মাঠে শেল্টার সেন্টার স্থাপন ও আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানের দাবি জানায়। তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষিত মানুষও বজ্রপাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় জানে না; অনেকেই গাছের নিচে আশ্রয় নেন- যা প্রাণঘাতী হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা ও উদ্ধার ব্যবস্থার দুর্বলতাও প্রাণহানির কারণ বাড়ায়। বজ্রপাতে আক্রান্তদের মধ্যে অনেকেই বিদ্যুৎপ্রবাহে হৃদযন্ত্র থামার কারণে মারা যায়; দ্রুত সিপিআর ও প্রাথমিক জীবনরক্ষা দিলে বাঁচার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় জরুরি সেবা পৌঁছাতে বিলম্ব, সিপিআর‑জ্ঞানহীনতা ও দুরত্ব এই সম্ভাবনাকে সীমিত করে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় স্তরে সাধারণ মানুষকে সিপিআর প্রশিক্ষণ দেয়া, দ্রুত রেসকিউ চেইন গঠন করা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর প্রস্তুতি বাড়ানো জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাতের প্রকোপ বাড়ছে- এটি শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফল নয়; মানুষের আচরণ, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ঘাটতিও মৃত্যুহার বাড়াতে ভূমিকা রাখে। তাই প্রযুক্তি ও প্রকল্পের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতাই বজ্রপাতে প্রাণহানি রোধের মূল চাবিকাঠি। এখনই যদি সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় কমিউনিটি মিলিয়ে কার্যকর, স্বচ্ছ ও টেকসই পদক্ষেপ নেয়, তবেই মাঠে বসে থাকা কৃষক, খেলাধুলা করা শিশু বা নদীর তীরে কাজ করা মানুষদের জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে- নাহলে বজ্রপাতে মৃত্যু থামবে না এবং প্রতিটি মৌসুমে এই তালিকা নতুন করে বড় হবে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

মাসের পরের অংশে ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি ভয়াবহ কালবৈশাখী আঘাত আনতে পারে

দিন দিন বাড়ছে বজ্রপাতে মৃত্যু, তবুও সচেতন হচ্ছে না মানুষ

আপডেট সময় ১২:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

দেশে প্রতি বছর শতশত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে বজ্রপাত। সামপ্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে; সরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সূত্র মিলিয়ে দেখা যায়, প্রতি বছর গড়ে প্রায় তিনশোর কাছাকাছি মানুষ বজ্রপাতে মারা যায় এবং চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই অর্ধশতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। বজ্রপাতে মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা নতুন কিছু নয়; ২০১৬ সালের মে মাসের ভয়াবহ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। তারপরও বাস্তবে প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব, প্রকল্পের অনিশ্চয়তা ও মাঠ পর্যায়ে তৎপরতার ঘাটতি বজায় আছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বজ্রপাতে মোট ৩ হাজার ৪২৫ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে; তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। ২০১৬, ২০১৯, ২০২১, ২০২৩-এ মৃত্যুহার বিশেষভাবে বেশি ছিল- এগুলোই নির্দেশ করে যে বজ্রপাত এখন আর কেবল নির্দিষ্ট মৌসুমের সমস্যা নয়, বরং বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের প্রোফাইল প্রায়ই একই রকম: মাঠে কাজ করা কৃষক, হাওরাঞ্চলের মানুষ, নদীর তীরের মৎস্যজীবী এবং খোলা মাঠে খেলাধুলা করা শিশুরা- তারা বজ্রগর্জন শুনে নিরাপদ আশ্রয় না নিলে ঝুঁকিতে পড়েন। চলতি বছরের বৈশাখ মাসেই একদিনে সর্বাধিক ১৩ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়; একই সময়ে একদিনে ১৪ জনের মৃত্যুর খবরও আসে- গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, নাটোর ও পঞ্চগড়ে এসব ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে কৃষকের সংখ্যা বেশি; এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪ জন নিহত কৃষক ছিলেন। সরকারি উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে বড় ফাঁক দেখা যায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির (টিআর) আওতায় ২০২১-২২ অর্থবছরে বজ্রনিরোধক দণ্ড ও লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় এবং ১৫টি বজ্রপ্রবণ জেলায় ৩৪৩টি যন্ত্র স্থাপনের কথা বলা হয়। কিন্তু পরে তদন্তে উঠে আসে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ; অনেক স্থানে যন্ত্র বসানো হয়নি, বা বসানো হলেও তা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নয়- বজ্রপাতপ্রবণ হাওরাঞ্চলের মাঝখানে না বসিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ বাজার বা বসতিপূর্ণ এলাকায় বসানো হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেও অনেক যন্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এমনকি বড় প্রকল্পের পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পায়নি; ২০২২ সালে প্রস্তাবিত এক হাজার ২৩২ কোটি টাকার প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পায়নি- ফলে মাঠ পর্যায়ে কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেনি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় ‘মাল্টিপারপাস শেড’ নির্মাণের একটি প্রকল্প প্রণয়ন চলছে। এই শেডগুলো হাওরাঞ্চলসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থাপন করা হবে; আকাশে বজ্রমেঘ দেখলেই কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারবেন। শেডগুলোর সঙ্গে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা থাকবে এবং এগুলো ধান মাড়াই, স্বল্প সময়ের ধান সংরক্ষণ ও বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। প্রাথমিকভাবে এক বিঘা জমির ওপর প্রতিটি শেড নির্মাণের চিন্তা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্প চূড়ান্ত করতে উপজেলা পর্যায় থেকে প্রস্তাব সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সব প্রস্তাব পাওয়ার পরই প্রকল্পের পরিধি নির্ধারণ করা হবে; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রস্তাব পাওয়ার পরও দুই মাসের মতো সময় লাগতে পারে। বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতা বাড়ানোকে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখেন সংশ্লিষ্টরা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের দুর্যোগ কমিটিগুলোকে এক পৃষ্ঠার সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে বজ্রপাত সতর্কতা প্রচারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে ডিসিদের সাড়া নেই- অধিদপ্তরের চিঠি পাঠানো হলেও অনেক জেলা থেকে কোনো প্রতিবেদন আসেনি। এফপিওসিজি (ফোকাল পয়েন্ট অপারেশনাল কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ) সভায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বজ্রবৃষ্টি ও বজ্রপাত সতর্কতা প্রচারের সুপারিশ থাকলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর কাজ আছে, কিন্তু তাদেরও সীমাবদ্ধতা। ‘সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম’ বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তাদের হিসাব অনুযায়ী বজ্রপাতে ২ হাজার ৫৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং এদের ৭০ শতাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। সংগঠনটি পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত বিষয়ক অধ্যায় সংযোজন, মোবাইল ব্রডকাস্টের মাধ্যমে পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়া, মাঠে শেল্টার সেন্টার স্থাপন ও আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানের দাবি জানায়। তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষিত মানুষও বজ্রপাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় জানে না; অনেকেই গাছের নিচে আশ্রয় নেন- যা প্রাণঘাতী হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা ও উদ্ধার ব্যবস্থার দুর্বলতাও প্রাণহানির কারণ বাড়ায়। বজ্রপাতে আক্রান্তদের মধ্যে অনেকেই বিদ্যুৎপ্রবাহে হৃদযন্ত্র থামার কারণে মারা যায়; দ্রুত সিপিআর ও প্রাথমিক জীবনরক্ষা দিলে বাঁচার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় জরুরি সেবা পৌঁছাতে বিলম্ব, সিপিআর‑জ্ঞানহীনতা ও দুরত্ব এই সম্ভাবনাকে সীমিত করে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় স্তরে সাধারণ মানুষকে সিপিআর প্রশিক্ষণ দেয়া, দ্রুত রেসকিউ চেইন গঠন করা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর প্রস্তুতি বাড়ানো জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাতের প্রকোপ বাড়ছে- এটি শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফল নয়; মানুষের আচরণ, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ঘাটতিও মৃত্যুহার বাড়াতে ভূমিকা রাখে। তাই প্রযুক্তি ও প্রকল্পের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতাই বজ্রপাতে প্রাণহানি রোধের মূল চাবিকাঠি। এখনই যদি সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় কমিউনিটি মিলিয়ে কার্যকর, স্বচ্ছ ও টেকসই পদক্ষেপ নেয়, তবেই মাঠে বসে থাকা কৃষক, খেলাধুলা করা শিশু বা নদীর তীরে কাজ করা মানুষদের জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে- নাহলে বজ্রপাতে মৃত্যু থামবে না এবং প্রতিটি মৌসুমে এই তালিকা নতুন করে বড় হবে।