মে মাসের প্রথম দিনটি এলেই আমরা বলি—শ্রমিকের দিন, শ্রমের মর্যাদার দিন। রঙিন ব্যানার, আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আর কিছু প্রতিশ্রুতির ভিড়ে দিনটি পার হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যায়—যাদের ঘামে শহর দাঁড়ায়, যাদের পরিশ্রমে অর্থনীতি সচল থাকে, সেই শ্রমিকদের জীবনে আসলে কতটা পরিবর্তন আসে?
শ্রমিক মানেই শুধু কারখানার ভেতরে কাজ করা মানুষ নয়; রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তায় ইট-খোয়া বহন করা মানুষটিও শ্রমিক। ভোরবেলা ঘুম ভাঙার আগেই যারা দিনমজুরির আশায় বেরিয়ে পড়ে, তারাও শ্রমিক। এমনকি ঘরের ভেতরে নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম করে যাওয়া নারীটিও এক অর্থে শ্রমিক। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই এখনো ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
আমাদের দেশে উন্নয়নের গল্প এখন জোরেশোরে বলা হয়। উঁচু ভবন, নতুন সড়ক, শিল্পকারখানার বিস্তার—সবই দৃশ্যমান। কিন্তু এই উন্নয়নের ভিত যে শ্রমিকদের কাঁধে দাঁড়িয়ে, তাদের জীবনের বাস্তবতা কতটা বদলেছে? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শ্রমিকের মজুরি বাড়ে না, কিন্তু জীবনযাত্রার খরচ ঠিকই বাড়ে। কাজের সময় দীর্ঘ, ছুটি সীমিত, আর দুর্ঘটনা ঘটলে দায় এড়ানোর প্রবণতাও কম নয়।
মে দিবসের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—অধিকার কেউ দেয় না, আদায় করে নিতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজও অনেক শ্রমিক নিজের অধিকার সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নয়, আর সচেতন হলেও তা আদায়ের পথ সহজ নয়। শ্রমিক সংগঠনগুলো অনেক সময় দুর্বল, আবার কোথাও কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব তাদের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে মে দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকতা হওয়ার কথা নয়; এটি হওয়া উচিত আত্মসমালোচনার দিন। সরকার, মালিকপক্ষ এবং সমাজ—সবারই দায়িত্ব আছে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা এবং তাদের সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা—এগুলো বিলাসিতা নয়, বরং মৌলিক প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আমরা অনেক সময় শ্রমিককে শুধুই ‘শ্রম’ হিসেবে দেখি, মানুষ হিসেবে নয়। অথচ তারও স্বপ্ন আছে, পরিবার আছে, বেঁচে থাকার ন্যূনতম সম্মান পাওয়ার অধিকার আছে।
মে দিবস তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয়, যখন সেই দেশের শ্রমিক শ্রেণি সম্মান ও নিরাপত্তা পায়। কেবল স্লোগানে নয়, বাস্তব কাজের মধ্য দিয়েই এই দিনের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
শ্রমিকের ঘামে ভেজা এই পৃথিবীটাকে একটু বেশি মানবিক করা—এই হোক এবারের মে দিবসের অঙ্গীকার।

ঘামেই গড়ে সভ্যতা, তবু শ্রমিক কেন বঞ্চিত?
মোঃ মাসুম আহমেদ 

















