রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে হঠাৎ করেই বোতলজাত সয়াবিন তেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পাঁচ লিটারের বোতল বেশির ভাগ দোকানেই পাওয়া যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত ঘিরে দাম বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে রাখছেন। এতে বাজারে চাহিদা বেড়ে গিয়ে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।
রোববার (৭ মার্চ) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালী, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, বাড্ডা ও দক্ষিণ বনশ্রীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক ও দুই লিটারের বোতল সীমিত পরিমাণে থাকলেও পাঁচ লিটারের বোতল অনেক দোকানেই নেই। কোথাও কোথাও আবার তেল থাকলেও একজন ক্রেতাকে একটির বেশি বোতল কিনতে দেওয়া হচ্ছে না।
দক্ষিণ বনশ্রীর মেরাদিয়া বাজারের কয়েকটি দোকানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেল একেবারেই নেই। এমনকি আশপাশের সুপারশপেও তেলের ঘাটতি দেখা গেছে। এক বিক্রেতা জানান, “সকাল থেকেই ক্রেতারা তেল কিনতে ভিড় করছেন। যাদের একটি বোতল লাগার কথা ছিল, তারাও দুইটি নিতে চাইছেন। ফলে দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, তিনি মূলত দুই লিটারের একটি বোতল কিনতে বের হয়েছিলেন। কিন্তু তিনটি মুদিদোকান ঘুরেও পাননি। পরে বাজারে কয়েকটি দোকান ঘুরে শেষ পর্যন্ত পাঁচ লিটারের একটি বোতল কিনতে হয়েছে। তার ভাষায়, “হঠাৎ তেলের এমন সংকট কেন হলো বুঝতে পারছি না।”
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েক দিন ধরেই ডিলারদের কাছ থেকে তেলের সরবরাহ কম পাওয়া যাচ্ছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের এক দোকানি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে তিনি দিনে ৮ থেকে ১০ কার্টন তেল আনতেন। কিন্তু গত কয়েক দিনে মাত্র ২ থেকে ৩ কার্টন পাওয়া যাচ্ছে। তাও আগের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
শাহজাদপুরের ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “কোম্পানিগুলো পাঁচ লিটারের বোতল দিচ্ছে না। দুই লিটারের বোতলও মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। কোম্পানি বলছে তাদের কাছে নাকি সরবরাহ কম।” আরেক বিক্রেতা ইলিয়াস হোসেন জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তাদের দোকানে নিয়মিত তেল আসছে না।
ডিলার পর্যায়েও তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে বলে জানান বিক্রেতারা। পাঁচ লিটারের একটি বোতল আগে ডিলারদের কাছ থেকে প্রায় ৯৩০ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন সেটি ৯৫০ টাকা পর্যন্ত কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা বিক্রেতাদের লাভ কমে গেছে।
বোতলজাত তেলের ঘাটতির মধ্যে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও বেড়েছে। কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, গত চার দিনে খোলা সয়াবিন তেলের দাম কেজিতে প্রায় ৫ টাকা বেড়ে ১৯৮ থেকে ২০০ টাকায় উঠেছে। খোলা পাম তেল বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি প্রায় ১৭০ টাকায়।
তবে তেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো বাজারে সরবরাহ সংকটের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সহকারী সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক তাসলিম শাহরিয়ার বলেন, “রমজানকে সামনে রেখে আমরা অতিরিক্ত তেল আমদানি করেছি। মাসে ৫০ হাজার টনের বেশি তেল সরবরাহ হচ্ছে। বাজারে সংকট হওয়ার কথা নয়।”
তিনি মনে করেন, গুজব বা আতঙ্কে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনে রাখছেন। এতে সাময়িকভাবে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
সিটি গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর বিশ্বজিৎ সাহাও বলেন, তাদের পক্ষ থেকে সরবরাহ কমানো হয়নি। তার মতে, কিছু ছোট কোম্পানি এলসি–সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তেল আমদানি করতে পারছে না। পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বাড়তি চাহিদাও বাজারে চাপ তৈরি করেছে।
ভোজ্যতেলের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভোক্তা অধিকার কর্মীরাও। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “ব্যবসায়ীরা প্রায়ই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেন। যুদ্ধের প্রভাব বাজারে পড়তে কিছুটা সময় লাগার কথা, কিন্তু তার আগেই দাম বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।”
বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরবরাহ সংকট ও দাম বৃদ্ধির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বাজারে তদারকি জোরদার করা হবে।

হাদি হত্যার আসামিদের দ্রুত দেশে আনা হবে: আইজিপি
অর্থনীতি ও বাণিজ্য ডেস্ক: 

















