• ঢাকা, বাংলাদেশ

ভূ-গভীরে বৃষ্টির পানি পাঠাতে নতুন প্রকল্প 

 obak 
09th Oct 2022 7:38 am  |  অনলাইন সংস্করণ

আনলাইন ডেস্ক:রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় বাড়ছে লবণাক্ততা। নলকূপে পানি উঠছে না; কোথাও-বা দূষিত কালো পানি উঠতে দেখা যাচ্ছে। পানির স্তর সুরক্ষা ও লবণাক্ততা দূর করতে নতুন একটি কৌশল নির্ধারণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিডব্লিউডিবি)। এরই মধ্যে ম্যানেজড অ্যাকোয়াফার রিচার্জ (মার) নামের প্রকল্পটির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখনও সরকারের অনুমোদন মেলেনি। কৃত্রিমভাবে ভূ-গভীরে বৃষ্টির পানি পাঠিয়ে দিতেই এ কৌশলের কথা ভাবা হচ্ছে।

সরকারও এমন একটি প্রকল্প নিতে চাচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) ভূগর্ভস্থ জলবিদ্যা অধিদফতরের পরিচালক ড. আনোয়ার জাহিদ। তিনি বলেন, মার প্রকল্পটি এখনো নেয়া হয়নি। উপকূলীয় অঞ্চলসহ যেসব এলাকায় পানির স্তর নেমে যাচ্ছে—শ্যালো গ্রাউন্ড ওয়াটার বা অগভীর ভূগর্ভস্থ পানিতে, যেখানে হালকা লবণাক্ততা আছে—সেসব এলাকায় বাস্তবায়ন করা হবে এই প্রকল্প।

তবে এমন উদ্যোগ থেকে কোনো কার্যকর ফল আসবে না বলে জানান পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক। তিনি বলেন, মার নামের এ প্রকল্প কার্যকর তো হবেই না; বরং এটি মারাত্মক ক্ষতিকর।


বর্তমানে যে অবস্থায় আছে মার

ভূ-গভীরের যেখানে পানির মজুত কম, সেখানে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টির পানি ঢুকিয়ে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন ড. জাহিদ। এ ছাড়া লবণাক্ততার মাত্রা কমিয়ে আনতেও এই কৌশল কাজে লাগানো হবে। এ জন্য কিছু পরীক্ষামূলক গবেষণাও হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগীয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (ডিপিইসি), ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা), বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও কিছু এনজিও এ গবেষণা করেছে।


আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘বিদেশিদের সহায়তায় এখন বড় আকারে ম্যানেজড অ্যাকোয়াফার রিচার্জ (মার) বাস্তবায়ন করবে সরকার। বাংলাদেশের ডেলটা প্ল্যানেও এ ধরনের প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত আছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি করে দেয়া হয়েছে। আমরা এটির খসড়া কৌশল তৈরি করেছি। যাতে উচ্চপর্যায়ের কমিটিও সম্মতি দিয়েছে। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের মতামত নিচ্ছি। এরপর কৌশলপত্র চূড়ান্ত করে আমরা সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠাব।’

বড় আকারে বাস্তবায়ন করার আগে কৌশলপত্র নির্ধারণ করা দরকার বলে মনে করছে সরকার। এরই মধ্যে মারের ওপর একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) করতে বলা হয়েছে।


তিনি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো), বিএমডিএ ও ওয়াসা এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। অর্থাৎ, একটি আমব্রেলা প্রকল্পের অধীন নিজ নিজ এলাকায় তারা মার বাস্তবায়ন করবে। যেমন: ঢাকায় ওয়াসা, বরেন্দ্র এলাকায় বিএমডিএ এটির দায়িত্বে থাকবে। তবে ডিপিপি তৈরির কাজটা শুরু হয়নি এখনও।

আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘আট-দশ বছর আগেই মার নিয়ে পাইলটিং শুরু হয়েছে। বরেন্দ্র ও উপকূলীয় এলাকায় হয়েছে। এতে বিভিন্ন এনজিও সহায়তা করেছে। এসব এলাকায় আমি ভ্রমণ করেছি। আমি ও নেদারল্যান্ডসের ডেলটারেস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের দুজন বিজ্ঞানী মিলে ম্যাপিং করেছি। বাংলাদেশের কোন কোন এলাকায় মার করা প্রয়োজন, কোন এলাকায় কোন প্রযুক্তির মাধ্যমে এটা বাস্তবায়ন করা হবে, তা যাচাই করে দেখেছি।

নদী, লেক, উপকূলীয় অঞ্চল, পানি ও মাটি নিয়ে গবেষণা করে ডেলটারেস। আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘প্রযুক্তি বলতে আমরা বোঝাতে চাচ্ছি, নলকূপ দিয়ে যেমন পানি তুলি, আবার নলকূপ দিয়ে তা মাটির গভীরে পাঠানো যায়। কোন এলাকায় কোন প্রযুক্তি উপযুক্ত হবে, নেদারল্যান্ডসের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মিলে আমি তা নির্ধারণ করেছি। এগুলো কৌশলপত্রে আছে।’


তার মতে, পানির স্তর পড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বৃহৎ ঢাকা ও বরেন্দ্র এলাকা। এসব এলাকার পানি নেমে যাচ্ছে। আবার উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা আছে। যেসব জায়গায় অগভীর ভূ-অভ্যন্তরে বেশি করে লবণাক্ততা আছে, সেসব এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের জন্য বর্ষাকালের বৃষ্টির পানি ভূগর্ভস্থ ওইসব লবক্ত জলাধারে সংরক্ষণ করা যেতে পারে ।

কতদিনের মধ্যে এটা বাস্তবায়ন করা যাবে–জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে হয়তো সরকারের অনুমোদন পাওয়া যাবে।

মারের আওতায় থাকছে না আর্সেনিক দূষণ

তবে আর্সেনিক দূষিত এলাকা ম্যানেজড অ্যাকোয়াফার রিচার্জ (মার) প্রকল্পের আওতায় থাকবে না। এই ভূগর্ভস্থ পানিবিদ বলেন, ‘যেসব স্তরে আর্সেনিক আছে, সেসব জায়গায় আমরা মারের কথা ভাবছি না। কারণ, আর্সেনিক দূষিত ভূ-অভ্যন্তরে বিশুদ্ধ পানি ঢুকিয়ে লাভ নেই। তবে এবার সফল হলে ভবিষ্যতে আমরা আর্সেনিক স্তরগুলোতে যাব। কারণ, বেশি বেশি পানি ঢোকালে হয়তো আর্সেনিকের মাত্রা কমে যেতে পারে।’

যদিও বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি বড় সমস্যা এখন পানিতে আর্সেনিক দূষণ। ১৯৯৩ সালে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় একটি জেলায় প্রথম নলকূপে আর্সেনিক দূষণ শনাক্ত হয়েছে। আবার গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে মানুষের খাবার পানির প্রধান উৎসই হচ্ছে নলকূপ। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের প্রকাশিত এক নিবন্ধ বলছে, বাংলাদেশের পাঁচ কোটি মানুষ আর্সেনিক দূষণের কবলে।


কেন এই প্রকল্প?

গেল ৫০ বছরে ঢাকার কেন্দ্রীয় অংশে প্রায় ৭৫ মিটার পানি নেমে গেছে। এ অবস্থা থেকে আগের পর্যায়ে যাওয়া কঠিন। কারণ, পানি তোলা হয়তো বন্ধ করা যাবে না। এই পানির স্তরের পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি করতে ব্যর্থ হলে ওয়াসার ক্রমবর্ধমান পানি উত্তোলনের খরচ আরও বাড়বে, পানির গুণমানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। শেষ পর্যন্ত  ভূ-অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে, যার ফলে ভূমি দেবে যেতে পারে।

 
এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ১৭৫টিরও বেশি ভূমি তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে, যার বেশির ভাগই ব্যাংকক, মেক্সিকো সিটি, জাকার্তা ও ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারার মতো বড় শহরগুলোতে ঘটে। মারের খসড়া কৌশল অনুসারে, ঢাকা ছাড়াও গাজীপুর ও উপকূলীয় এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। আর তা কাটিয়ে উঠতে মানুষের খাওয়া, কৃষি, শিল্প ও পরিবেশ সুরক্ষায় বিশুদ্ধ পানি সহজলভ্য করবে এই প্রকল্প।

 মারের খসড়া কৌশলে বলা হয়েছে, ভূগর্ভস্থ পানি সম্পদ যাতে ফুরিয়ে না যায় এবং ভূমির অবনমন না ঘটে, তা নিশ্চিত করতেই এ প্রকল্প। এ ছাড়া কূপ, ঝরনা, জলাভূমি ও পানিপ্রবাহ শুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে হবে। উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির উৎস তৈরি করাও মারের উদ্দেশ্য। এ ছাড়া বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, শিল্পকারখানার প্রবৃদ্ধি ও বৃহৎ ঢাকা-গাজীপুর অঞ্চলে সমৃদ্ধি বজায় থাকবে মার বাস্তবায়ন হলে। এতে আরও বলা হয়, যেসব অঞ্চলে পানির সংকট, সেখানে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ বাড়াবে। কৃষিবিপ্লবের মাধ্যমে বরেন্দ্র অঞ্চলে খাদ্যে সমৃদ্ধি ঘটাবে। আর চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে খাবার ও সেচের পানির সরবরাহ টেকসই করবে।


শহুরে এলাকায় বন্যা ও জলবদ্ধতা কমিয়ে আনতে বাড়ির ছাদে পানি ধরে রাখার কৌশল অবদান রাখবে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

ড. জাহিদের বলেন, ‘এগুলোর বিপক্ষেও লোকজন আছে। তারা বলছেন, রিচার্জ করতে গেলে পানির মান বজায় রাখা যাবে কি না। মান বজায় রাখতে না-পারলে যদি দূষিত পানি ভেতরে ঢুকে যায়, তাহলে সেখানকার পানি আরও নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু মারের অর্থই হচ্ছে কোনো দূষিত পানি ঢোকানো যাবে না। দূষণমুক্ত করেই তা মাটির ভেতরে পাঠাতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন ফিল্টার ব্যবস্থা আছে। যে কারণে সবার আগে আমরা বৃষ্টির পানি ব্যবহারের কথা ভাবছি। কারণ, তা পরিশোধনের দরকার নেই।’

যেভাবে বাস্তবায়ন হবে মার

বৃষ্টির পানি বাড়ির ছাদ থেকে পাইপের মাধ্যমে ভূগর্ভে ঢুকিয়ে দেয়া হবে রিচার্জ-ওয়েলের মাধ্যমে। সরাসরি পানি ভেতরে দিলে তাতে ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। যে কারণে প্রাথমিক দূষণ দূর করতে পানি রিচার্জ-ওয়েলে ঢোকার আগে ট্যাংকের মতো করে বালু, ইটের খোয়া কিংবা কয়লা স্তর করে দেয়া হবে। আর তাতে কিছু দূষণ দূর হবে।


ঢাকার ভবনের কাঠামোর সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই পরিকল্পনা যায় কি না–জানতে চাইলে আনোয়ার জাহিদ বলেন, ঢাকার ভবনগুলো যেভাবে আছে, তাতেই হবে। এতে পানি ধরে রাখার দরকার নেই। একদিকে বৃষ্টি হবে, আর অন্যদিকে ছাদ থেকে পাইপে করে পানি রিচার্জ-ওয়েলে দিয়ে দেয়া হবে। এমন ব্যবস্থা করা হবে, যাতে পানি ফিল্টার হয়েই রিচার্জ-ওয়েলে যেতে পারে। তাতে প্রাথমিক দূষণ থাকবে না।

রিচার্জ-ওয়েলের অন্য নাম ইনজেকশন-ওয়েল। ভূ-গভীরে সরাসরি পানি পাঠিয়ে দিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে পানি ফিল্টার করার ব্যবস্থাও থাকে।

ওয়াসা যেভাবে গভীর নলকূপ ব্যবহার করে পানি তুলছে, তা বহাল রেখেই কী মার বাস্তবায়ন করা হবে–জানতে চাইলে আনোয়ার জাহিদ বলেন, বহাল রেখে করতে চাচ্ছি না। কারণ, ওয়াসা নিজেরাই বলেছে—এখন তারা যে পানি সরবরাহ করে, তার ৭৬ শতাংশ আসে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে, বাকি ২৪ শতাংশ অন্য উৎস থেকে পরিশোধন করে দেয়া হয়।

এরই মধ্যে মহাপরিকল্পনা করেছে ওয়াসা। অদূর ভবিষ্যতে তাদের ২০ শতাংশ পানি ভূগর্ভ থেকে, বাকি ৮০ শতাংশ আসবে ভূ-উপরিভাগ থেকে। তবে তারা তা কবে বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা জানা সম্ভব হয়নি। তারা ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে উপরিভাগেরটা বাড়িয়ে দেবে।

ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে শঙ্কা

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন বলছে, ভূ-গভীর থেকে পানি তোলার দিক থেকে বাংলাদেশ ষষ্ঠতম অবস্থানে আছে। অর্থাৎ যেসব দেশ মাটির গভীর থেকে বেশি পানি তোলে, তাদের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ।


বিশ্বব্যাংকের গবেষণা থেকে জানা গেছে, নিরাপদ খাবার পানির সংকটের কারণে বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে। বর্তমানে সুপেয় পানির জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশ। এ ছাড়া সেচকাজ, গৃহকর্ম ও শিল্পকারখানা ৭৭ শতাংশ পানির প্রয়োজন মেটাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি।

কৃষির বাইরেও অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা হচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্পে। ৩ হাজার ৮৬২টি পোশাক কারখানার অধিকাংশই ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে অবস্থিত। এর মধ্যে ওয়াশিং, ডাইং ও ফিনিশিং (ডব্লিউএফ) কারখানা রয়েছে ৮০০-র মতো। এক কিলোগ্রাম বস্ত্র তৈরিতে ৩০০ লিটার পানি খরচ হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে যা ছয় গুণ বেশি।

বাংলাদেশ ওয়াটার পার্টনারশিপ হুঁশিয়ারি করে বলেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ ভূগর্ভের ওপরের অ্যাকোয়াফারের পানি ফুরিয়ে যাবে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে এই সংকট দেখা যাবে। আর তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে শিল্প এলাকায়। এতে ব্যাপক হারে ভূমির অবনমন ঘটবে। আর ভূ-উপরিভাগের খাবার পানির উৎস কমে যাবে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছর মেয়াদি গবেষণা উদ্যোগ ম্যাপড ইন বাংলাদেশ (এমআইবি) অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন ৫৯ লাখ ঘনমিটার থেকে বেড়ে ১ কোটি ঘনমিটার ছুঁতে পারে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির গড় গভীরতা বর্তমানে ৭৮ মিটার থেকে বেড়ে ১৩২ মিটার নিচে চলে যেতে পারে।

ঢাকার অবস্থা যেমন

পানিসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি প্রতিকূলতার মুখে থাকা শহরগুলোর একটি ঢাকা। বিশেষ করে খাবার পানি নিয়ে এ শহরের বাসিন্দাদের ব্যাপক ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউর তথ্যানুসারে, বিশ্বের ষষ্ঠ ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকা। শহরটির প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩ হাজার ২৩৪ জনের মতো মানুষ বাস করেন। বাংলাদেশের রাজধানীতে এখন ২ কোটি ২৪ লাখ ৭৮ হাজারের বেশি মানুষ থাকেন।

ম ইনামুল হক বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির দুটির স্তর থাকে, একটি হচ্ছে গভীরের পানির স্তর, অন্যটি অল্প গভীর। গভীর আর অগভীর। শ্যালো টিউবওয়েল, হাতের চাপকলগুলো অগভীর স্তর থেকে পানি তোলে। ঢাকা শহরেও প্রচুর অগভীর নলকূপ ছিল। সেগুলো এখন অকেজো। কারণ, অগভীর পানির স্তরটা আর বিশুদ্ধ নেই। ওয়াসার অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে চাপকলগুলোর পানি উত্তোলন ক্ষমতার অনেক নিচে নেমে গেছে।

তিনি বলেন, এখন ডিপ-টিউবওয়েলগুলো গভীর স্তর থেকে পানি তোলে। ঢাকা শহরের অনেক বড় বড় ভবন ও ওয়াসা গভীর নলকূপ দিয়ে পানি তোলে। এই পানির স্তরটা অনেক গভীর। গভীর ও অগভীরের মাঝে একটা স্তর আছে, যেটা দিয়ে পানিটা নিচে যায় না। অগভীরের পানিটা গভীরে যায় না। অগভীর পানিটা আস্তে গড়িয়ে নদীতে চলে যায়, খালে যায়। কিন্তু গভীরের পানির রিচার্জ অগভীর থেকে হয় না। সেটা দূরবর্তী ব্রহ্মপুত্র নদ আছে, যমুনা নদী আছে, সেখান থেকে দূরের তলা থেকে আসে।

এই প্রকৌশলী বলেন, ঢাকা শহরে যে পানিটা তোলা হচ্ছে, সেটা গভীর স্তরের। এ পানি উত্তর থেকে দক্ষিণের সাগরের দিকে আসছে। উত্তর থেকে যে পানিটা আসছে, তা যমুনা নদী থেকে মধুপুরের গড়ের তলা দিয়ে আসছে। এ জন্য ঢাকা শহরে যতই পানি তোলা হোক না কেন; পানি আসতেই থাকে। ওই গভীর নলকূপের পানি যদি নেমে যায়, কিন্তু সেটা অন্য কারণে নামে। সাকসন বা অতিমাত্রায় টান দেয়ার জন্য এই পানি নামছে। আর এটা স্তর নামে না, টিউবওয়েলের পানি তোলার স্তর নামে। টিউবওয়েল পানি সাকসন করতে পারে না। বেশি পানি টানার জন্য এই ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু গভীরে সাকসন বসালে পানি পাওয়া যাবে।

মারের সফলতার গল্প

মারের কোনো সফলতা আছে কি না–জানতে চাওয়া হয়েছিল যুক্তরাজ্যের পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ হকের কাছে। জবাবে প্রবাসী বাংলাদেশি এই শিক্ষক কয়েকটি উদাহরণ সামনে নিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে একটি তিউনিসিয়ার তেবোলবা অ্যাকুইফার সিস্টেমের, যেখানে ১৯৭০-এর দশকে পানির স্তর প্রায় ৩৫ মিটারে নেমে গিয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকে ইনজেকশন বা রিচার্জ-ওয়েল ব্যবহার করে তা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

১৮৪৫ ও ১৯৬৭ সালের মধ্যে অত্যধিক পানি উত্তোলনের কারণে কীভাবে লন্ডন অববাহিকার কেন্দ্রে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় ১০০ মিটারে নেমে গিয়েছিল; তা-ও তিনি ব্যাখ্যা করেন। এটি এখন অনেকাংশে স্থিতিশীল, যা আইনি ব্যবস্থাপনায় পানি উত্তোলন হ্রাস করার মাধ্যমে সম্ভব হয়েছিল। বর্তমানে মার লন্ডন বেসিনে অ্যাকুইফার ম্যানেজমেন্ট কৌশলগুলোরও অংশ হয়ে উঠছে।


কিন্তু ঢাকা শহরের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তাকে কিছুটা হতাশা প্রকাশ করতে দেখা যায়।কারণ, ঢাকা ওয়াসা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তিনি ড. জাহিদের সঙ্গে একমত যে ঢাকায় বৃষ্টির পানিভিত্তিক ইনজেকশন ওয়েল ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ, ছাদ থেকে সংগ্রহ করা হলে এতে সবচেয়ে কম ময়লা থাকবে। তবে প্রধান অনিশ্চয়তা হলো কীভাবে এই বর্তমান বৃষ্টির পানি ভূ-রাসায়নিকভাবে ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে—যা কিনা মূলত হাজার বছরের পুরোনো—প্রতিক্রিয়া করবে।

যদি পাইলট প্রকল্পে দেখা যায় যে রাসায়নিক বিষয়টি কোনো সমস্যার কারণ হবে না; তবে বৃষ্টির জলভিত্তিক মার ঢাকার কিছু অংশে জলাবদ্ধতা নিরসনেও সাহায্য করতে পারে। জলাবদ্ধতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, কম বৃষ্টিপাত বা সাধারণ সময়ে জলাবদ্ধতা হয় কি না; উত্তর স্বাভাবিকভাবেই ‘না’। জলাবদ্ধতা মূলত ঘটে ভারি বৃষ্টিপাতের সময় ভবন থেকে বৃষ্টির পানি তাৎক্ষণিকভাবে ছেড়ে দেয়ার কারণে। পানি ছাড়ার হারেরও কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। কিন্তু আমরা যদি একটি পরিকল্পনার অধীন ভারি বৃষ্টিপাতের পানি ধীরে ধীরে ছাড়ি, কিংবা এটি সংগ্রহ করে মারের জন্য ব্যবহার করি, তাহলে আমরা জলাবদ্ধতা কমাতে সক্ষম হতে পারি।

২০০৩ সাল থেকে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে গবেষণা করছেন ড. হক। তার মতে, ঢাকা ওয়াসা তাদের পানির কূপগুলো স্থাপনের অবস্থান নির্ণয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করছে না। বরং শহরটিকে একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ পানি নিষ্কাশন প্রকল্পে পরিণত করেছে। ওয়াসার পানির নলকূপগুলো যত্রতত্র থাকায় পার্শ্বীয় প্রবাহকে শহরের কেন্দ্রস্থলে আসতে দিচ্ছে না। যে কারণে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর।

এই বিজ্ঞানী বলেন, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির পরিস্থিতি এমনটা হতো না, যদি ওয়াসা তাদের একটি উৎপাদক নলকূপ থেকে অন্য নলকূপের অবস্থানের পর্যাপ্ত জায়গায় ফাঁক রেখে করিডোর তৈরি করত, যা পার্শ্বীয় প্রবাহকে ঠিক রাখত।

প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘আমরা কেন ঢাকার পানির জন্য গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জের কথা বিবেচনা করছি না? অত্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ এবং দুর্দান্ত গুণমান নিয়ে কোনো বাধা নেই; বরং আমাদের অভাব বাস্তবায়নের মতো একটা কৌশলের। একটি বিজ্ঞানভিত্তিক নীতির অধীন দূর থেকে ঢাকার জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ভূপৃষ্ঠের পানি শোধনের ওপর নির্ভর করার চেয়ে অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগতভাবে অনেক বেশি সুবিধাজনক হবে। পানি ছাড়া কেউ বাঁচতে পারে না। কিন্তু এর সঠিক উৎস নির্বাচনে আমাদের সত্যিই বাস্তববাদী হতে হবে।’

মার নিয়ে ভিন্নমত

বৃষ্টির পানি তলায় নিয়ে যেতে যদি কোনো প্রকল্প করা হয়, এগুলো পরীক্ষামূলক যা কখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন ম ইনামুল হক। তিনি বলেন, যখন পানি ওপর থেকে তুলে নিয়ে নিচে দিয়ে দেবে, তখন তা গভীর না—অগভীর স্তরে পৌঁছাবে। ১০, ২০ কিংবা ৫০ ফুট তলায় পানি রিচার্জ করতে পারবে তারা। এখানে বৃষ্টির পানি দিয়ে কী দূষণ দূর করবে? এভাবে এই পানি হালকা করতে পারবে না।

তার মতে, তারা যখন বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে পাঠাবে, সে পানিটা তো দূষণমুক্ত। বরং এই পানিটা সরাসরি মানুষকে সরবরাহ করতে পারলে অনেক কাজে দেবে। তা না-করে গভীরে যখন দেয়া হবে, একটা দূষণমুক্ত পানি আবার দূষিত করার জন্য তা মাটির গভীরে পাঠানো হবে। তারা ডিপ অ্যাকোয়াফারকে না; বরং শ্যালো অ্যাকোয়াফারকে পানি দেবে। অর্থাৎ, অগভীর স্তরকে দেবে। অগভীর স্তরে কোনো ভালো পানি নেই। সেখানে কতটুকু বৃষ্টির পানি ঢোকাবে, ঢুকিয়ে ঘোলা করে তারা দূষণকে কতটুকু হালকা করবে? তা করে তো লাভ নেই। কোনো কাজের কাজ হবে না, অপচয় ছাড়া।

তিনি বলেন, পানির স্তর নামছে অতিরিক্ত টানার কারণে। কিন্তু স্তর নেমে তো পানি ওঠা বন্ধ হয়ে যায়নি। নেমে গিয়ে আর নামবে না। কারণ, একটা লিমিট আছে। একটা সময় পর পানির স্তর নিচে নামবে না।

তবে মারের সফলতা নির্ভর করছে এটা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, কারা করছে, তার ওপর বলে জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কাজী মতিন আহমেদ। তার মতে, যদি ঠিকমতো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়, তবে অবশ্যই কাজ দেবে। কাজেই মার কার্যকর হবে না বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

তিনি বলেন, কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুটি ইস্যু থাকে, একটি কারিগরি, অন্যটি আইনগত। এখন কারিগরিগতভাবে কাজটা ঠিকমতো করা, আইনগতভাবে কাজটা কাদের দায়িত্ব। তারা কাজটি ঠিকমতো করছে কি না, তা দেখতে হবে।
সূত্র : সময় টিভি
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
এই বিভাগের আরও খবর
 

আর্কাইভ

March 2024
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031